বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে ২০২৬ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১০ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল সরবরাহের পূর্বাভাস দিয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কেএপিএসএআরসি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক প্লাস উৎপাদন কমানোর প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে শিথিল করার পরিপ্রেক্ষিতে এ সরবরাহ উদ্বৃত্ত তৈরি হবে। তবে এ অবস্থায় জোটটি তাদের বাজারহিস্যা পুনরুদ্ধারে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলেও মত কেএপিএসএআরসির। কেননা উৎপাদন বাড়লে জ্বালানি তেলের দাম কমার ঝুঁকি রয়েছে। খবর এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল।
সর্বশেষ প্রান্তিক পূর্বাভাসে কেএপিএসএআরসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে জ্বালানি তেলের বাজারে দৈনিক ২ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত সরবরাহ দেখা যাবে, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ১০ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছবে।
কেএপিএসএআরসি আরো বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেল উৎপাদন ২০২৫ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে। তবে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে আসায় জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা আশানুরূপ বাড়বে না। ওপেক প্লাস আগামী এপ্রিল থেকে উত্তোলন কোটা বাড়ানো শুরু করবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে আগামী দুই বছরে সরবরাহের বড় কোনো ঘাটতি দেখা যাবে না বলেও জানিয়েছে কেএপিএসএআরসি। ওপেক প্লাসের উৎপাদন কমানোর নীতি শিথিলীকরণ, ওপেক প্লাসবহির্ভূত দেশগুলোর উত্তোলন ও চাহিদা বৃদ্ধি নিয়ে আশঙ্কার কারণে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে এটি নির্ভর করছে ওপেক প্লাসের নীতি ও ভূরাজনৈতিক কৌশলগুলোর ওপর।’
গত ডিসেম্বরে ওপেক প্লাস জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত তাদের উৎপাদন কোটার সীমা অপরিবর্তন থাকবে। এর আগে গত বছরের অক্টোবর থেকে দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল উৎপাদন কমানোর পরিকল্পনা করেছিল।
জোটের প্রতিনিধিরা বলছেন, প্রথম প্রান্তিকে পরিশোধনাগার রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সম্ভাব্য বাজার সংকট এড়ানোর উদ্দেশ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কেএপিএসএআরসি তাদের পূর্বাভাসে বলেছে, প্রথম প্রান্তিকে দৈনিক অতিরিক্ত সাড়ে তিন লাখ ব্যারেল সরবরাহ দেখা যাবে।
এপ্রিল থেকে ওপেক প্লাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে দ্বিতীয় প্রান্তিকে অতিরিক্ত সরবরাহ বেড়ে ৫ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছবে। উত্তর গোলার্ধের গ্রীষ্মকালীন চাহিদার কারণে বাড়তি সরবরাহের কিছু অংশ ব্যবহার হলেও পুরোপুরি সম্ভব হবে না। অন্যদিকে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চাহিদা কমার কারণে অতিরিক্ত সরবরাহ আরো বাড়বে।
কেএপিএসএআরসির মতে, চীনের অর্থনীতি পূর্বাভাসের তুলনায় ভালো করলে অতিরিক্ত সরবরাহ কমার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া রফতানিকারক দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা কিংবা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অতিরিক্ত সরবরাহ কমতে পারে। তবে কেএপিএসএআরসি বলছে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হলে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়তে পারে।
ওপেক প্লাসের মন্ত্রীরা বলছেন, বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় উৎপাদন কমানো বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সৌদি আরব ও রাশিয়ার যৌথ নেতৃত্বে নয় দেশের এক পর্যবেক্ষণ কমিটি আগামী ফেব্রুয়ারিতে বৈঠকে বসবে। পুরো জোটের বৈঠক হবে আগামী ২৮ মে। তবে কেএপিএসএআরসির মতে, আপাতত কোনো নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
প্রতিষ্ঠানটি তাদের আগের প্রান্তিক প্রতিবেদনের তুলনায় বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের চাহিদা ২০২৫ সালে দেড় লাখ ব্যারেল কমা এবং সরবরাহ ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। এ সংশোধনীর ফলে চাহিদা ২০২৫ সালে দৈনিক ১২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল বাড়বে। সরবরাহ বাড়বে ১৪ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল।
কেএপিএসএআরসি বলছে, অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম কমে যেতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো ২০২৬ সালে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিতে পারে।
তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে জ্বালানি তেলের চাহিদা বার্ষিক মাত্র ২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল এবং ২০২৬ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল বাড়বে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেক কম। তবে ভারত এ সময়ে চাহিদা বৃদ্ধিতে চীনকে ছাড়িয়ে যাবে বলে কেএপিএসএআরসি জানিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেলের চাহিদা দুই লাখ ব্যারেল, আফ্রিকায় ১ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল ও লাতিন আমেরিকায় ১ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সৌদি সরকারের তহবিলে পরিচালিত হলেও স্বাধীনভাবে গবেষণা করার দাবি কেএপিএসএআরসির।